না ফেরার দেশে চলে গেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। ১৪ মে (বৃহস্পতিবার) সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে ৮৪ বছর বয়সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন তিনি।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন, তখন এই  বিভাগেরই ছাত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের ছিল আজীবনের ছাত্রী-শিক্ষক সম্পর্ক।

শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে কখনোই কার্পণ্য করতে না শেখ হাসিনা।  যখনই তাদের দেখা হতো সেখানে একটি আবেগঘণ পরিবেশ সৃষ্টি হতো।

প্রতিবছর তেমনই কিছু দৃশ্যপটের দেখা মিলতো বাংলা একাডেমির  একুশে গ্রন্থমেলার উদ্বোধনী দিনে।

বরাবরের মতোই ভাষার মাসের প্রথম দিনে বইমেলা শুরু হয়। এর উদ্বোধনীতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলা একাডেমি প্রতিবছর বইমেলার আয়োজন করে আসছে। আর এতদিন এর চেয়ারম্যান ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। তিনিও অতিথি থাকতেন ওই অনুষ্ঠানে।

অনুষ্ঠানটিতে প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে লাল গালিচাও পাতা হয়। কিন্তু প্রায় প্রতিবারই প্রধানমন্ত্রী সেই লাল গালিচা ছেড়ে দেন তার শিক্ষক আনিসুজ্জামানের সম্মানে।

তারপর আনিসুজ্জামানকে সঙ্গে নিয়ে স্টলগুলো ঘুরে দেখেন শেখ হাসিনা।

২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও বরাবরের মতো লাল গালিচা নিজে ছেড়ে নিচ দিয়ে হেঁটেছিলেন শেখ হাসিনা। এ অবস্থায় আনিসুজ্জামানের ঘাড় থেকে সরে আসা চাদরটি পরম মমতায় ঠিক করে দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী।

উপস্থিত সাংবাদিকরা দ্রুতই এই মুহূর্তটি ক্যামেরায় ধারণ করে রাখেন। পরদিন জাতীয় পত্রিকাগুলোতে ছবিটি ছাপা হয় এবং প্রসংশিত হয়।

তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

প্রধানমন্ত্রী এ সময় শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অনন্য অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করে  বলেন, তাঁর মতো বিদগ্ধ ও জ্ঞানী মানুষের মৃত্যুতে দেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি হলো।

 

আনিসুজ্জামান থেকে জাতীয় অধ্যাপক:

 

বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান এই অধ্যাপক ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। ভারত ভাগের পর তারা এপারে চলে আসেন।

আনিসুজ্জামানের শিক্ষাজীবন শুরু কলকাতার পার্ক সার্কাস হাইস্কুলে। এখানে তৃতীয় শ্রেণি থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর বাংলাদেশে চলে আসেন। পরে খুলনা জেলা স্কুলে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হন।

এক বছর পর পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন এবং প্রিয়নাথ হাইস্কুলে (বর্তমান নবাবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন।

১৯৫১ সালে এ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও ১৯৫৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগে ভর্তি হন।

১৯৫৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও ১৯৫৭ সালে একই বিষয়ে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৫৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি বাংলা একাডেমির গবেষণা বৃত্তি লাভ করেন। একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজ আমলের বাংলা সাহিত্যে বাঙালি মুসলমানের চিন্তাধারায় ১৭৫৭-১৯১৮ বিষয়ে পিএইচডি শুরু করেন।

১৯৫৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৬৫ সালে শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উনিশ শতকের বাংলার সাংস্কৃতিক ইতিহাস: ইয়ং বেঙ্গল ও সমকাল বিষয়ে পোস্ট ডক্টরাল ডিগ্রি অর্জন করেন।

১৯৬৯ সালের জুনে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের রিডার হিসেবে যোগ দেন।

স্বাধীনতা যুদ্ধকালীন গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে যোগ দেন তিনি।

১৯৭৪-৭৫ সালে কমনওয়েলথ অ্যাকাডেমি স্টাফ ফেলো হিসেবে তিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে গবেষণা করেন।

১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকল্পে অংশ নেন।

 

১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে আসেন। ২০০৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।

 

তিনি নজরুল ইনস্টিটিউট ও বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

 

শিল্পকলাবিষয়ক ত্রৈমাসিক পত্রিকা যামিনী এবং বাংলা মাসিকপত্র কালি ও কলমের সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন এই গবেষক।

 

তিনি ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।

 

এছাড়াও বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সদস্য ছিলেন।

 

প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিক্ষায় অবদানের জন্য ১৯৮৫ সালে একুশে পদ ও ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার প্রধান করা হয়।এছাড়া ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ, দুবার আনন্দবাজারপত্রিকার আনন্দ পুরস্কার, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট. ডিগ্রি এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক পেয়েছেন।

২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

ডঃ আনিসুজ্জামান এর মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি,স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরসহ আরো অনেক জাতীয় নেতৃবৃন্দ।

তার অকাল প্রয়ানে Exbit.today গভীরভাবে শোকাহত।

Leave a Reply