অনেকদিন হল লিখতে চাচ্ছিলাম করোনা নিয়ে। চেষ্টা করেছি সবাইকে কিছু তথ্য দেবার জন্য। জানি অনেকেই এখন অনেক সচেতন। তবে সময় নিয়ে পরে দেখবেন। কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞাস করতে পারবেন। সবার জন্য উন্মুক্ত।

মিজেলস বা হাম রোগ সবচেয়ে ছোঁয়াচে রোগ। যেখানে ১ জন মানুষ ১২-১৮ জন মানুষকে সংক্রামণ করতে পারে। এই সংখ্যা হল প্রাথমিক সংক্রামণ সংখ্যা। যাকে গবেষকরা বলেন R0. গবেষকরা এইটা দিয়ে একটি অসুখ কতখানি সংক্রামণ তা হিসাব করেন। জিকা ভাইরাস যার R0 হল ৩-৬.৬। কিন্তু সিজনাল ফ্লু যা মাত্র R0 ১.৩. কভিড-১৯ হল ২-২.৫। একটা তুলনা করা যাক।

সিজনাল ফ্লু ও করোনা ভাইরাস এর লক্ষণ গুলো হল একই রকম।
জ্বর, কাশি, গায়ে ব্যাথা, অবসাদ ভাব সহ অনন্যা ছোট ছোট উপসর্গ। সবাই জানেই এখন। তবে এইটাও জানে যে শেষে নিউমোনিয়া বেধে যায় ও তাতে মৃত্যুর আশঙ্কা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

আমাদের জানতে হবে সিজনাল ফ্লু ও করোনা ভাইরাস। সবই একই রকম। তাই সবার ধারনা আছে এইটা ফ্লু এর মত, তাই চিন্তা করার কিছু নাই। কিন্তু আসলেই কি তাই? আসুন দেখি সংক্রামণ এর হারটা কতখানি, গবেষকদের ভিত্তিতে।
ফ্লু এর রোগী ১০ ধাপ পার হলে এর সংক্রামণ সংখ্যা দাঁড়াবে ৫৬ জন।
আর যদি করোনা ভাইরাস ১০ ধাপ পার হলে সংক্রামণ দাঁড়াবে ২০৪৭ জনে।

আসুন আরেকটা তথ্য দেখি, প্রতি বছরে আমেরিকায় ফ্লু তে মারা যায় ৬০,০০০ জন এর মত। (বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের কোন আপ টু ডেট তথ্য নাই। যা আছে অনেক পুরাতন, তাই আমেরিকার তথ্য নিয়েই এখানে বলছি) আর এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস এ মারা গেছে ২২৭,২৯০ জন পুরো দুনিয়াতে। আর আমেরিকাতে ৬১,১১২ জন। মানে মার্চ এর প্রথম থেকে আজ পর্যন্ত ৩০ এ এপ্রিল পর্যন্ত শুধু আমেরিকাতেই মারা গেছে যতজন, তা এক বছরে ফ্লু তে মারা যাওয়ার সংখ্যার থেকে বেশী। এখন পর্যন্ত ১০ লাখেরও বেশী মানুষকে আক্রান্ত করেছে এই ভাইরাস। আর এখনো আক্রান্ত আছে সাড়ে আট লাখ মানুষ। আর প্রতিদিন মারা যাচ্ছে ১৫০০ থেকে ২০০০ এর মত শুধু আমেরিকাতে। করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর হার, ফ্লু এর মৃত্যুর হার থেকে বেশী হয়ে গেছে। আরও তো সামনের দিন বাকি আছেই। আর পুরো পৃথিবীতে মারা যাচ্ছে ৭০০০ থেকে ১০,০০০ এর মত। তারমানে আমরা করোনা কে ফ্লু এর সাথে আর তুলনা করতে পারি না। আমাদের এখনই সতর্ক হওয়া উচিৎ। নইলে আমাদের আরও অনেক বেশী মূল্য দিতে হতে পারে।
এখন আসুন বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কিছু তথ্য দিয়ে বোঝার চেষ্টা করি আমরা কতখানি বিপদের মাঝে আছি।

গত এক সপ্তাহের তথ্য দেখি
আমাদের বর্তমানে করোনা রোগীর সংখ্যা ৭,১০৩ জন।
২৩ এ এপ্রিলে করোনা আক্রান্ত ছিল ৪১৮৬ জন।
২৯ এ এপ্রিলে করোনা আক্রান্ত ৭১০৩ জন। এক সপ্তাহে বেড়েছে ২৯১৭ জন।
যা প্রতিদিন গড়ে ৪১৬ জন এর মত।
আমাদের বর্তমানে করোনা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা ১৬৩ জন।
২৩ এ এপ্রিলে করোনা মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১২৭ জন।
২৯ এ এপ্রিলে করোনা মৃত্যুর ১৬৩ জন। এক সপ্তাহে বেড়েছে ৩৬ জন।
যা প্রতিদিন গড়ে ৫ জন এর বেশী।

আমাদের বর্তমানে করোনা রোগ থেকে ভাল হয়ে গেছেন ১৫০ জন।
২৩ এ এপ্রিলে করোনা রোগ থেকে ভাল হয়েছিলেন ১০৮ জন।
২৯ এ এপ্রিলে করোনা রোগ থেকে ভাল হয়েছেন ১৫০ জন।
এক সপ্তাহে ভাল হয়েছেন ৪২ জন।
যা প্রতিদিন গড়ে ৬ জন।

যাইহোক এইবার আসি রোগের ভয়াবহতা নিয়ে।

আমরা জানি সমস্যা আরও আসছে, আমরা এখনো অনেক পিছনে আছি। ভাইরাস সংক্রামণ এর হার এখনো অনেক কম বাংলাদেশে। (তবে বাস্তবিক অবস্থা কিন্তু আলাদা) কারন “WHO” মতে যত পারুন টেস্ট করুন, যা আমরা করতে পারছি না বা করার সক্ষমতা হয়ত নাই। তবে কিছু কিছু ভুল পদক্ষেপ নেবার জন্য আমাদের অনেক মূল্য দিতে হতে পারে।
আগে যা বলছিলাম ফ্লু ও করোনা ভাইরাস এর প্রথম ও প্রধান পার্থক্য হল এইটা কত দিন লাগতে পারে এর উপসর্গ প্রকাশ পেতে ও কতদিন পরে বোঝা যায়, কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে?
যখন কেউ করোনা বা কভিড-১৯ এ সংক্রামণ হবে, তখন থেকে মোটামুটি বলা যায় ৫ দিন লাগবে উপসর্গ বা লক্ষণ প্রকাশ পেতে, যা অনেক সময় ১৪ দিন ও লেগে যেতে পারে। এই সময়টাকে বলা হয় ইনকিউবিশন বা রোগের ঘুমান্ত সময়। এই সময়টাকে সংক্রামণের সময়ও বলা হয়ে থাকে। এই সময় একে অন্যকে সংক্রামণ করার সময়।
তারমানে ১-১৪ দিন যে কেউ সংক্রামিত হবে, কিছু বোঝার আগেই। আর অন্যদিকে সিজনাল ফ্লু এর ইনকিউবিশন এর সময় মাত্র ২ দিন। মানে যেদিন সংক্রামণ ঘটবে তারপরের দিন থেকেই উপসর্গ দেখা দিবে। তাহলে ফ্লু তে ওই সময় সংক্রামণ ঘটতে পারে। করোনা ভাইরাস এ যে কেউ ১-১৪ দিনের মাঝে যে কাউকে রোগ ছড়াতে পারে, নিজের অজান্তেই। যা এই করোনা কে ফ্লু থেকে আলাদা করেছে।
আর আমরা জানি যে, আমাদের শরীরের ইমুইন বা রোগ প্রতিরোধ করার জন্য যে শক্তি রয়েছে, তা এই ভাইরাস কে আগে কখনোই দেখে নাই, বা আমরা জন্ম থেকে এই রোগের প্রতিরোধ নিয়ে জন্মায়নি। বা কারো শরীরে এই ভাইরাস এর প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রাকৃতিক ভাবে তৈরি হওয়ার কোন সুযোগ নাই।

আমাদের অনেকের শরীরে সিজনাল ফ্লু এর বিরুদ্ধে কাজ করার জন্য এন্টিবডি আগে থেকেই আছে, অনেকের ফ্লু এর ভ্যাকসিন নেওয়া আছে। এই ভ্যাকসিন, ফ্লু ভাইরাস এর বিস্তর রোধ করে। যখন একজন ফ্লু ভাইরাসে সংক্রামণ হয়, তখন সে অন্যকে সংক্রামণ করতে গেলে, যার ফ্লু এর বিরুদ্ধে ইমুউন বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আছে। সে কখনই অন্যকে সংক্রামণ করবে না বা ফ্লু ছড়ানোর আগেই সে সহ সকলে মিলে একটা প্রতিরোধ প্রাচীর তৈরি করবে, যা অন্যের মাঝে আর ছড়াতে দিবে না। তখন ফ্লু আর ছড়াতে পারে না।

কিন্তু কভিড-১৯ বা করোনা ভাইরাস এক্কেবারিই নতুন। যা আগে কারো ছিল না এর কোন ভ্যাকসিন ও নাই। তারমানে করোনা ভাইরাস সবার মাঝে ছড়াতে পারে খুব সহজেই। আর এর কোন প্রতিশোধক ও নাই। যা সবাইকে এই ভাইরাস থেকে দুরে রাখতে পারে।

আরেকটা তথ্য দেখি।
সি ডি সি এর তথ্য অনুযায়ী
ফ্লু ভাইরাস এ ২% হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার পরে। কিন্তু করোনা ভাইরাস এর ক্ষেত্রে ২০-৩১% হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার পরে। কারন শরীরের অক্সিজেনের ঘনত্ব যখন ৯০ এর নিচে চলে যায় তখন শরীরকে কৃত্রিম ভাবে অক্সিজেন দিতে হয়। স্বাভাবিক অক্সিজেনের মাত্রা (স্যাচুরেশন) ৯৫- ১০০%। তাই ২০-৩১% করোনা রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দরকার পরে কৃত্রিম ভাবে অক্সিজেন নেবার জন্য। আর ৩-৫% রোগীর কৃত্রিম ভাবেও অক্সিজেন নিতে পারে না, তখন তাদেরকে ভেন্টিলেটর এর মাধ্যমে অক্সিজেন দিতে হয়।

মৃত্যুর হার হিসাবে
করোনা ভাইরাসে মৃত্যুর হার ১-৩%
আর ফ্লু তে মৃত্যুর হার ০.১% যা আমেরিকাতে মৃত্যু ঘটে ৬০,০০০ এর মত। তবে মনে রাখবেন এই করোনা ভাইরাস এ মৃত্যুর হার ফ্লু থেকে ১০ গুন বেশী। এইটা আসলেই ভয়ঙ্কর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের অবশ্যই গুরুত্ব দেওয়া উচিৎ।

বর্তমানে হিসাবে আসি এবারঃ
আমেরিকাতে এ পর্যন্ত করোনা রোগী ১০ লাখ এর উপরে, আজ পর্যন্ত মৃত্যুর হার ৫.৭৯% যা ৬১০০০ এর উপরে। যা করোনা ভাইরাস এ মৃত্যুর হার থেকে অনেক বেশী। এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত (সক্রিয়) সাড়ে আট লাখ (৮৫০,০০০) এর উপর। যা ৮০% এর উপরে। আর ভাল হয়ে যাওয়ায় রোগীর সংখ্যা দেড় লাখের (১৪৫,০০০) মত যা ১৩% এর উপরে।

বাংলাদেশে এ পর্যন্ত করোনা রোগী ৭১০৩ জন। আজ পর্যন্ত মৃত্যুর হার ২.২৯% যা ১৬৩। এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত (সক্রিয়) ৬৭৯০ জন। যা ৯৫.৫% এর উপরে। আর ভাল হয়ে যাওয়ায় রোগীর সংখ্যা ১৫০ জন যা ২.১% এর মত।

আরেকটা তথ্য, যারা ফ্লু এর সাথে মিলাতে চাচ্ছেন, জেনে রাখুন ফ্লু তে ১-৩% মানুষ মারা যায় যেখানে সকল বয়সের মানুষ থাকে। কিন্তু করোনা তে মারা যাওয়ার হার কিন্তু ১- ১৫% এর মাঝে সব বয়সের। তবে দিন দিন তথ্য আরও আপ টু ডেট হচ্ছে। তাই চোখ কান খোলা রাখুন।
আসলেই সব কিছু নির্ভর করছে আমাদের সব কিছু বোঝার ও সেভাবে পদক্ষেপ নেবার উপর।

আর মনে রাখবেন ফ্লু, যা কভিড-১৯ আলাদা

  • কত সক্রিয় সংক্রামণশীল?
  • সক্রামন হওয়ার পরে বুঝতেই পারবে না যে এইটা তার নিজের মাঝে আছে ও অন্যকে ছড়াচ্ছে নিজের অজান্তেই।
  • কত সহজেই একে অপরকে ছড়ানো সম্ভব
    কিছু কিছু গবেষকদের ধারনা এইটা পুরো বিশ্বের ২০-৬০% মানুষকে সংক্রামিত করবে এই করোনা।

করোনা ভাইরাস এর কোন ভ্যাকসিন নাই বা কোন কিউর বা আরোগ্য নাই। এই সংক্রামণ থেকে আমাদের আমরাই বাঁচাতে পারি। এই সিরিয়াল বা চেইন ব্রেক বা ভাঙতে হবে।
তা হলে কি ভাবে ? তা একমাত্র
সামাজিক দূরত্ব বা সোশাল ডিস্টান্সিং। ইমুনিটি বা রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। যতদিন পর্যন্ত কোন ভাইরাস এর ভ্যাকসিন তৈরি না হচ্ছে। যতক্ষণ পারা যায় বাসায় থাকা। তা শুধুমাত্র সম্ভব আমরা যদি এই করোনা ভাইরাস কে গভীর ভাবে অনুধাবন করতে পারি। যতটুকু কম সংক্রামণ ঘটে ততই ভাল। এই সময় চুপ করে থাকার সময় না, সবাইকে বলতে হবে এবং সবাইকে অনুধাবন করতেই হবে। তাহলে আমরা এগিয়ে যেতে পারব।
আমাদের সামর্থ্য অল্প, আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপ্রতুল, আমাদের অনেক সমস্যা আছে। আমাদের এখন থেকেই একটু শক্ত হয়ে সবাইকে জানাতে হবে ও সবাইকে বুঝতে হবে।

তবে এখনো বলা যাবে না যে, করোনা কতদূর পর্যন্ত নিয়ে যাবে? আর আমরা কতটা ভাল পদক্ষেপ নিতে পারব? সময় হয়ত এখনো আছে, আমরা ভাল পদক্ষেপ নিলে দেশে করোনা রোগী অনেক কম হবে। উপরের উপাত্ত নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যতের পদক্ষেপের উপর।
প্রশ্ন করুন নিজেকে।

আমরা কি “WHO” এর নিয়ম মেনে চলছি
১। বাসায় থাকুন
২। নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখুন
৩। হাত ও মুখ সব সময় ধৌত করুন।
৪। আপনার কাশি ঢেকে রাখুন
৫। অসুস্থ্য বা অসুস্থ্যবোধ করছেন- কল করুন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা কে।
প্রতিদিন অনেক অনেক নতুন তথ্য আসছে, তবে একমাত্র ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত, সবাই ঠিক ভাবে চলার চেষ্টা করি।
ইতিহাসে স্প্যানিশ ফ্লু ছিল অনেক মারাত্মক, তা ২ বছর পর্যন্ত ছিল, চলেও গেছে কাউকে কিছু না বলে, তবে অনেক জীবন নিয়ে। আসুন এখন আমরা অনেক সচেতন। আমরা পারব, আমাদের পারতেই হবে।

তথসূত্র:- ডা: সোহান রিয়াদ

Leave a Reply